বিছানা ছেড়ে উঠতে না পারা ফাহমিদা সেদিন নিজেই পরেন লাল বেনারসি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:‘মৃত্যু অবধারিত’ জানতেন ফাহমিদা। কারণ দেশ-বিদেশের চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন- তার আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই। তবু সবকিছু জেনেও যেন হাসানকে নিয়ে আরো কয়েকটি দিন বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি। হয়তো পুরোনো সেই স্বপ্নে বিভোর হতে চেয়েছিলেন আরো একটিবার।

কিন্তু তার স্বপ্নরাঙা মায়াবী শরীরে বাসা বাধা মরণঘাতী ক্যানসার তা আর হতে দিল না। বিয়ের ১২ দিনের মাথায় সবাইকে ছেড়ে ফাহমিদা পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। সোমবার সকালে নগরীর বাকলিয়া এলাকায় নিজ বাসায় মারা যান তিনি।

দক্ষিণ বাকলিয়ার বাসিন্দা ফাহমিদা কামাল ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিনের মেয়ে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো। ফাহমিদা নগরীর বেসরকারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করেন। তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কর্মকর্তা সাইফুদ্দিন সাকীর নাতনি।

অন্যদিকে, ফাহমিদার স্বামী মাহমুদুল হাসানের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায়। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করেন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কর্মকর্তা সাইফুদ্দিন সাকী বলেন, ফাহমিদাকে আর বাঁচানো গেল না। তার কপালে সুখের সংসার জুটল না। বাদ আছর নিজ বাড়িতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

তিনি বলেন, হাসানকে বিয়ে করাতে অনেকটা সুস্থ হয়েছিলেন ফাহমিদা। বিয়ের পর নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু আমাদের ফাহমিদা এখন আর নেই।

শিক্ষাজীবনে পরিচয় ফাহমিদা ও হাসানের। সেখান থেকে ভালোলাগা। একপর্যায়ে সেই ভালোলাগা রূপ নেয় ভালোবাসায়। এক সময় ফাহমিদার শরীরে মরণঘাতী ক্যানসার ধরা পড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নেয়া হয় রাজধানীর এভারকেয়ার ও পরবর্তীতে ভারতের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে।

দীর্ঘ এক বছর সেখানে চিকিৎসা নেয়ার পর চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন- বেঁচে থাকার আর সম্ভাবনা নেই ফাহমিদার। কিন্তু এ অবস্থায়ও প্রিয়তমার হাতটি ছেড়ে দেননি হাসান। মৃত্যুপথযাত্রী ফাহমিদাকে দেন বিয়ের প্রস্তাব। তার এমন প্রস্তাবে পরিবারের সবার পাশাপাশি হতবাক হন ফাহমিদাও। পরে উভয় পরিবারের সম্মতিতে গত ৯ মার্চ চট্টগ্রাম নগরীর মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালের বেডেই এক টাকা কাবিনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বিয়ের দিন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন ফাহমিদা। অসুস্থ হওয়ার আগের দিনগুলোর মতোই সেদিন মুখে হাসি লেপ্টে ছিল তার। যে ফাহমিদা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারতেন না, সেই ফাহমিদাই সেদিন বিছানা থেকে উঠে পরেন বেনারসি শাড়ি। হাতে চুড়ি, গলায় অলংকারে সাজেন নতুন বউ। বরকে আংটি পরিয়ে দিয়ে অদল-বদল করেন গলার মালাও।

এরপর থেকে হাসপাতালেই শুরু হয় তাদের সুখের সংসার। মাঝে একদিন তারা গিয়েছিলেন বাসায়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ফের হাসপাতালে ফিরে যান। কথা ছিল সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে নতুন করে সংসার শুরু করবেন এ দম্পতি। কথামতো ফাহমিদা বাড়ি ফিরেছেন ঠিকই, তবে সুস্থ হয়ে নয়; নিথর হয়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here