জীবনে কিছুই পাইনি, বারবার পুরুষের কাছে হেরে গেছি

নিউজ ডেস্কঃবিসিএস ক্যাডার হতে চেয়েছিলেন ২৪ বছর বয়সী সাদিয়া সাথী। এজন্য ভাঙতে হয়েছিল প্রথম সংসার। মন দিয়েছিলেন লেখাপড়ায়। এর মধ্যেই প্রেমিক পুরুষ হয়ে হাজির হন মাইনুল। তার সঙ্গেই দ্বিতীয় সংসার বাঁধেন সাথী। কিন্তু তার জীবনে ছিল ভালোবাসার হাহাকার। তবু দুঃখ আর নির্যাতন নিয়ে কাটাচ্ছিলেন দিন। শেষমেশ সাদিয়ার জীবনটাই নিয়ে নিলেন দ্বিতীয় স্বামী।

সাদিয়ার দ্বিতীয় স্বামী মাইনুল ইসলাম বরিশাল জেলা ডিবি পুলিশের কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত। তার নির্যাতনেই সাদিয়া নিহত হয়েছেন বলে দাবি স্বজনদের। এদিকে, সাদিয়ার লাশ উদ্ধারের চারদিন পার হলেও এখনো কোনো মামলা নেয়নি বলে জানিয়েছে পরিবার। এরই মধ্যে সাদিয়ার লেখা একটি ডায়েরি পাওয়া গেছে। যেখানে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন তথ্য।

বরিশাল কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিমুল করিম বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলেই সাদিয়া হত্যার কারণ উদঘাটন হবে। তখন অভিযুক্তের প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া বর্তমানে একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করেন, মাইনুলের বিরুদ্ধে নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ তোলা ঘটনাটিকে আরো জটিল করেছে। সাদিয়ার আত্মহত্যার পেছনে অভিযুক্ত মাইনুলের প্ররোচনা থাকতে পারে। তবে এখন কিছুই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। সাদিয়ার লেখা ৯টি চিঠিই ছিল ডিবি পুলিশ সদস্য মাইনুল ইসলামকে নিয়ে।

সাদিয়ার বড় বোনের স্বামী কেদারপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূরে আলম ব্যাপারী বলেন, সাথীকে প্রথমে পারিবারিকভাবে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার প্রথম স্বামী ছিলেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মী। সাদিয়া চাকরি করতে ইচ্ছা পোষণ করায় প্রথম স্বামীর দ্বিমত থাকায় সেই সংসার ভেঙে যায়।

সাদিয়া সরকারি ব্রজমোহন কলেজে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী ছিলেন। ওই কলেজ থেকে ইংরেজিতে লেখাপড়া শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হতে চেয়েছিলেন। তার জীবনে একটাই ইচ্ছা ছিল যত বাধাই আসুক বড় সরকারি চাকরি করতে হবে। এজন্য বিসিএস কোচিং করতেন এবং বাসায় প্রচুর লেখাপড়া করতেন।

কোচিংয়ের শিক্ষকরা আমাকে বলেছে, লেখাপড়ায় আমরা ধরে নিয়েছি ৪৪তম বিসিএসে বরিশালে একজন যদি চান্স পায় সেটি হবে সাদিয়া সাথী। কিন্তু তা তো আর হলো না।

সাদিয়া সাথির বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমার মেয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ প্রতারণা করেছে। মাইনুল নিজে কনস্টেবল হলেও আমাদের কাছে এসআই পরিচয় দিতেন। সাদিয়ার কাছেও সেই পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া তার আরেকটি সংসার রয়েছে। সেই ঘরে রয়েছে দুটি সন্তান। এসব তথ্য আমরা জেনেছি সাদিয়ার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বেশ দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল।

সাদিয়ার লেখা ডায়েরিতেও বার বার উল্লেখ করা হয়েছে ডিবির কনস্টেবল মাইনুলের প্রতারণার কথা। উল্লেখ আছে মাইনুলের জন্য ভালোবাসার হাহাকার। একটু মানসিক শান্তিও আশ্রয়ের আকুতি।

২২ ফেব্রয়ারি রাতে মাইনুলকে পাখি সম্বোধন করে সাদিয়া লিখেছেন, ‘নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই। তবে একটা কথা মনকে বোঝাই, এই পৃথিবীতে অনেকের অনেক অঙ্গ-প্রতঙ্গ নেই আর আমার নেই তুমি। আজ সারাদিন তোমাকে মিস করেছি। তাই আগামীকাল থেকে রোজা রাখব।’

তারিখ ছাড়া আরেকটি পাতায় লিখেছেন, ‘জীবনে কিছুই পাইনি। বারবার পুরুষ লোকের প্রতারণার কাছে হেরে গেছি। নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিলাম তোমাকে। একটু আশ্রয় চেয়েছি খারাপ মানুষের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। আমার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমি তোকে বিশ্বাস করে ঠকেছি। তোকে তো টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার সবই দিয়েছিলাম। তাহলে কেন এমন করলি? এত মিথ্যা কেন বললি? কী অপরাধ করেছি? জীবনের কাছে হেরে গেলাম। ঠকে গেলাম। তুই জিতে গেলি। ভালো থাকিস মাইনুল।’

সাদিয়ার বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেন, মাইনুল জানতো সাদিয়া কখন তার মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাবে। সেভাবেই সে এসে হয়তো অপেক্ষা করছিল। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে বাসায় ফেরায় সাদিয়াকে মেরে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে ক্ষুব্ধ মাইনুল। এরপর আমাদের পরিবারের লোকদের মোবাইলে কল করে জানিয়েছে সাদিয়া আত্মহত্যা করেছে। প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, যদি সাদিয়া আত্মহত্যা করে তাহলে সে বাইরে বসে জানল কেমনে?

৭ মার্চ বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের বৈদ্যপাড়ায় একটি ভবনের পাঁচতলা থেকে সাদিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এক বছর আগে সাদিয়াকে প্রেম করে বিয়ে করে বরিশালে ভাড়া বাসায় থাকতেন বরিশাল জেলা ডিবির কনস্টেবল মাইনুল ইসলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here