উদ্যোক্তা গল্প:জিনাত আরা

জিনাত আরা:

মানুষের জীবনে আশা থাকে, আকাঙ্খা থাকে।আশা আকাঙ্খা যখন লাগামহীন ঘোড়ার মত ছুটতে থাকে তখন কূল কিনারা না পেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়।আমিও এর ব্যাতিক্রম নই।
পরিবার থেকেই একটা সুপ্ত স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছিল মা স্বাবলম্বি হওয়ার জন্য।কিন্তু অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছিল সে স্বপ্নে বীজ নানা প্রতিকূল অবস্থার কারনে। স্বাবলম্বী হওয়ার বিরুদ্ধে কর্তার সব সময় নিরুৎসাহিত মনোভাব আর গ্রাজুয়েশন করে কিছু করতে না পারার যন্ত্রণা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল।হঠাৎই ছোট বোনের ইনভাইটে একটা গ্রুপে জয়েন হই।সারা দিন সবার কাজ নিয়ে পোস্ট দেখে অবাক হই আর সাহস সঞ্চার করে মনস্হির করে সোর্সিংয়ের জন্য অনলাইনে অর্ডারটা দিয়েই ফেললাম।কিন্তু এতই কি সহজ সব কিছু? তারপরও ধৈর্য্য নিয়ে লেগে ছিলাম আর আজও আছি বিক্রির চিন্তা না করে শুধুমাত্র কাজের প্রতি অগাধ ভালোবাসা নিয়ে আমি এখনো টিকে আছি প্রায় দের বছর ধরে তার নাম না নিলে আমাকে অকৃতজ্ঞ হয়েই থাকতে হবে।আর সেটা হলো Wemen and e-commerce forum (WE).উই আমাকে শিখিয়েছে কি করে দৃঢ় চিত্তে নিজেকে অটল থাকতে হবে।কাস্টমার হ্যান্ডেল করা,ফটোগ্রাফি করা,পণ্যের কোয়ালিটি ধরে রাখা,ব্যাবসা সংক্রান্ত যত যা কিছু আছে একজন পরিপূর্ণ উদ্যোক্তা হওয়ার যত রকম যা ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ,মাষ্টার ক্লাস আছে সবই উই করে থাকে।সর্বোপরি একজন মানুষকে মানুষ হিসেবেই তৈরি করে।যার মূল ফোকাসই হলো মেয়েদের আত্বসন্মানের সাথে আত্মপরিচয় তৈরি করা,স্বাবলম্বী করা,দক্ষ করা।

এখন আবার সামিটের মতো এত বড় মাপের একটা আয়োজন।সেখানে উপস্থিত থাকা অনেক বড় একটা ভাগ্যের ব্যাপার।উই নারীদের শুধু চারদেয়ালে বন্দি রেখে কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। বরং নারীদের বাইরের জগতের আলোর সন্ধান দিচ্ছে জ্ঞানের পরিধি বিকশিত করার জন্য নানা কৌশল করছে।ভাবা যায় সাধারন থেকে অতি সাধারন নারীরা আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে যাবে।সন্মানিত করবে জয়ী এওয়ার্ড দিয়ে।এটা কেবল উইয়ের পক্ষেই সম্ভব।কারন মনেই যদি বড় হতে না পারে তাহলে কাজে বড় কিভাবে হবে নারীরা।এসব জায়গায় অংশগ্রহণ করলে মন বড় হয়।পৃথিবীটা চোখ মেলে দেখার অনুভব উই নারীদের শিখিয়েছে।

কিছু বুঝে হোক আর না বুঝে হোক লেগে ছিলাম।কিন্তু উই আমাকে নিরাশ করেনি।জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পাই।এটা অনেক বড় একটা সন্মান আমার জন্য। টাকার মাপকাঠিতে কখনো সন্মান বিচার করা যায় না।তাই আমার কাছে সন্মানটাই মূখ্য। হাজারো প্রতিকূল অবস্হা আমাকে পুড়িয়ে,দগ্ধ করে আরও শক্ত হতে শিখিয়েছে।আমি জানি আমি পারবো আমাকে পারতেই হবে।

আমাদের সমাজের প্রতিটি মেয়েরই উচিত কিছু না কিছু করা অর্থাৎ আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়া।পিছন থেকে টেনে ধরার জন্য পরিবার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। কিন্তু এটাকেই যদি অনুপ্রেরণা হিসেবে গন্য করে শক্ত মনোবল নিয়ে এগিয়ে যায় তাহলে একটা নারী পারেনা এমন কিছু পৃথিবীতে নেই।লোক সমাজের আর ধর্মের দোহাই দিয়ে পিছিয়ে পড়ে নারীরা।কিন্তু এই লোক সমাজ কখনো পাশে এসে দাড়ায় না।তাই এদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রুখে দাড়াতে হবে।কামড় দিতে না পাড়লেও ফনা তুলে ফোস করতে হবে।নইলে সারাজীবন বিষে নীলবর্ণ ধারন করে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়বে।

যুদ্ধ কিন্তু আমরা প্রতিদিন করি। কাজ, সমাজ, সংসার,বাচ্চা এসব যুদ্ধ নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।এসব অজুহাত হতে পারে কিন্তু কখনো বাধা হতে পারেনা। মেয়েরা সব সামলে আবার নিজের অফিস বা ব্যবসাকেও পরিচালনা করতে পারে।আমি জানি একজন নারী যেমন ঘর সামলাতে দক্ষ তেমনি অফিস বা ব্যাবসা চালাতেও সমান পারদর্শী। যা একটা পুরুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব না।

আমি প্রতিদিন যুদ্ধ করেই এ পর্যায় এসেছি কোন রকম মানষিক ও আর্থিক সাপোর্ট ছাড়াই।পরিশ্রমকে ভালোবাসায় রুপান্তরিত করে আর পন্যের কোয়ালিটির সাথে আপোষ না করে এগিয়ে যাচ্ছি স্বপ্নের পথে।সে স্বপ্নকে অক্সিজেন,খাবার,পানি দিয়ে বাচিয়ে রেখেছে Wemen and e-commerce forum (WE) গ্রুপ।বারো লক্ষ পরিবারে ছয় লক্ষ উদ্যোক্তা বেঁচে আছে উইয়ের ছায়া তলে।উইয়ের জন্যই আজ আমি কাজের উদ্যোগ গ্রহন করেছি আর টিকেও আছি।

উই গ্রুপের কর্নধার হলেন নাসিমা আক্তার নিশা আপু। যার অক্লান্ত পরিশ্রম আর নারীর আর্থিক স্বাধীন হওয়ার জন্য ছায়ায় আবৃত্ত করে রাখার বটবৃক্ষ হলো তার উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই) গ্রুপ।

জিনাত আরা
বরিশাল ডিসট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর।
উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম(উই)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here