অভাবের তাড়নায় হাজারো শিক্ষার্থী এখন শ্রমিক

আবুল কালাম আজাদ:মহামারি করোনার কারনে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থীই আর স্কুলে আসছে না। অভাব অনটনসহ নানা কারণে স্কুল ছেড়ে অনেকেই কোন না কোন পেশায় সহযোগি হিসেবে কাজ করছে। অনেক মেয়েরই এই সময়ে গোপনে বাল্য বিয়ে দিয়েছেন বাবা মা। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে স্কুল খুললেও তারা আর স্কুলে আসছে না। তাদের স্কুলে ফিরিয়ে আনাই দুস্কর !

পাবনা সদর উপজেলার জাফরাবাদ গ্রামের শিশু নাইমুল। ঐ এলাকার জাফরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণিতে পড়তো। গত বছর করোনার কারনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে দীর্ঘদিন বাড়িতেই বসে ছিল সে। সংসারেও অভাব অনটন। পিতা অসুস্থ, তাই গত প্রায় একবছর হলো নাইমুল পাবনা শহরের একটি দোকানে কর্মচারি হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছ

বৃহস্পতিবার দুপুরে পাবনা শহরে কথা হয় নাইমুল এর সাথে। দুই ভাইয়ের মধ্যে নাইমুল বড়। ছোট ভাই তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। পড়ালেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পিতা অসুস্থ হওয়ায় দীর্ঘদিন বসে থাকার পর ৩ হাজার টাকা বেতনে সে কাজে যোগ দিয়েছে।

করোনায় ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে স্কুল বন্ধ থাকার সময় নাইমুলের মতো পাবনায় অনেক শিক্ষার্থী বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন কাজে যোগ দেয়। অনেক শিশুরা নানা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর এসব শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে না। গত কয়েক দিন ধরে স্কুল খোলা হলেও গ্রামের হতদরিদ্র কিছু পরিবারের শিশুদের উপস্থিত হতে দেখা যায়নি বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে কত শিক্ষার্থী স্কুলে আসছে না তা নির্দিষ্ট করে সংশ্লিষ্টরা এই মুহুর্তে বলতে পাড়ছেন না। তবে ধারণা করা হচ্ছে অনুপস্থিতির সংখ্যা কয়েক হাজার হতে পারে।

পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিলচলন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র অনিক। করোনায় স্কুল বন্ধের পর তারও লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে স্থানীয় একটি ওয়েল্ডিং কারখানায় কাজ করছে সে। অনিকের বাবা মালেক পেশায় একজন রং মিস্ত্রী। তিনি জানান, আমরা গরীব মানুষ। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পাড়ার খারাপ ছেলেদের সাথে মেলামেশা থেকে বিরত করার জন্য এবং পরিবারের অভাব থেকে মুক্তি পাবার আশায় ছেলেকে কাজ করতি দিছি।

সদর উপজেলার সাদিপুর গ্রামের শিশু রাহাদ। গত শিক্ষাবর্ষেও রাহাদ পাবনা শহরের গোপাল চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তো। তবে সে এখন পুরোদস্তুর হোসিয়ারী শ্রমিক। করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকায়, পশ্চিম সাধুপাড়া এলাকার একটি গেঞ্জির কারখানায় কাজ শিখতে দেয় তাদের পরিবার। স্কুল খোলার ঘোষণা এলেও, থমকে যাওয়া শিক্ষা জীবন নতুন করে শুরু করতে আগ্রহী নয় সে। পরিবারেরও খুব একটা ইচ্ছা নেই। তাই কিছুদিন আগেও বই খাতা নেয়া রাহাদের শিশু হাত এখন কর্মজীবী শ্রমিকের হাত। শিশু শ্রমিক রাহাদ প্রতি সপ্তাহে বেতন পায় ১৫০০ টাকা। মাসে আয় ৬০০০। ওভারটাইম করলে আরো বেশী হয়। নিজের হাত খরচের পাশাপাশি তার আয়ের উপর নির্ভশীলতা এসেছে পরিবারেও। এখন স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই বলে রাহাত জানায়।

উপজেলার শানিকদিয়ার গ্রামের মাহমুদুল হাসান পলাশ স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র ছিল। করোনায় স্কুল বন্ধ ঘোষণার পর থেকে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। গত ৫-৬ মাস ধরে সে সবজি ব্যবসা শুরু করেছে। রাজাপুর গ্রামের চাঁদ আলীর ছেলে আজিজুল হক তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। গয়েশপুর কুমিল্লা গ্রামের ইয়াছিন হোসেন ৫ম শ্রেণির ছাত্র ছিল। এরা দুই জন এখন পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়ে মোটর সাইকেল মেরামতের কাজ শিখছে।

নাইমুল, রাহাদ, অনিক, পলাশ, ইয়াছিনের মতো অর্থ উপার্জনে জড়িয়ে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়ার এ চিত্র পাবনা জেলার সর্বত্রই। করোনার বিরতিতে বখে যাওয়া ঠেকানোর অজুহাতে ছেলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কারখানার কাজে আর মেয়েদের গোপনে বিয়ে দিয়েছেন অভিভাবকরা। প্রত্যন্ত গ্রামে তো বটেই শহরের স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরাও শিকার হয়েছেন বাল্যবিবাহের। এছাড়াও কলেজ পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদান করেছেন। অনেকে আবার জীবিকার তাগিদে অটোবাইক চালানো শুরু করেছেন।

পাবনা শহরের পশ্চিম সাধুপাড়া এলাকার হোসিয়ারী মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, করোনায় স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় গ্রাম এলাকার অধিকাংশ বাচ্চারাই মোবাইল ফোনের গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছিল, উঠতি বয়সীরা আরো বিপথগামী হওয়ায় অনেক বাচ্চাদের বাবা মা এসে আমাদের অনুরোধ করে অনেকটা জোর করেই কাজে দিয়ে গেছে। তখন অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় মানবিক বিবেচনায় আমরা তাদের কাজ শিখতে নিয়েছিলাম। এখন স্কুল খোলার পড়েও তারা কাজ ছাড়তে চাইছে না। নিষেধ করার পরেও প্রতিদিন কারখানায় চলে আসছে।

এদিকে, করোনাকালের দীর্ঘ বিরতি শেষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলছে ১২ সেপ্টেম্বর। তবে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও বাল্যবিবাহে জড়িয়ে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে প্রায় ঝড়ে পড়া এসব শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে স্বীকার করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরাও। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাওয়া ভাবনায় ফেলেছে শিক্ষক, কর্মকর্তাদের।

পাববনা সদর উপজেলার শহীদ স্মরনিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস, এম, শাহজাহান বলেন, ১২ সেপ্টেম্বর স্কুলে ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেশ ভালোই আছে। তবে এখনো যেসব শিক্ষার্থী স্কুলে আসেনি আমরা তাদের বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছি। বাড়িতে যোগাযোগ করছি স্কুলে ফিরিয়ে আনার জন্য।

চাটমোহর উপজেলার বিলচলন স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ আলতাব হোসেন জানান, মাত্র কয়েকদিন হলো স্কুল খুলেছে। যে সব ছাত্ররা স্কুলে অনুপস্থিত রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাচ্ছেন সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য।

পাবনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম মোসলেম উদ্দিন বলেন, করোনায় বাল্যবিবাহ ও শিক্ষার্থীদের আর্থিক কাজে জড়ানোর খবর পেলেও সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। সবে স্কুল খোলা হয়েছে। দু’এক সপ্তাহ গেলে বোঝা যাবে। স্কুলে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তালিকা করে, অভিভাবকদের বুঝিয়ে তাদের শ্রেণি কক্ষে ফেরাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। এ জন্য অভিভাবক সমাবেশ করে এবং শিক্ষকদের বাড়িতে বাড়িতে পাঠয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করার চেষ্টা করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here