রোমহর্ষক ঘটনার আধার ড্যাভেলিস গুহা

নিউজ ডেস্কঃরহস্যময় পৃথিবীর অনেক কিছুই মানুষের অজানা। প্রকৃতির পরতে পরতে সৌন্দর্য ও রহস্য দুটোই আছে। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের রহস্যের প্রতি রয়েছে প্রবল আকর্ষণ। আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে অজানা অনেক কিছুই জেনেছে মানুষ। আবার অনেক কিছুই ব্যাখ্যাহীন থেকে গিয়েছে। রহস্যময় অনেক স্থান সম্পর্কে রয়েছে রোমহর্ষক অনেক কাহিনি। তেমনই একটি স্থান ড্যাভেলিস গুহা।

রোমহর্ষক ঘটনার আধার ড্যাভেলিস গুহার অবস্থান গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের ৪০ কিলোমিটার উত্তরে পেন্টেলিতে। এ গুহা সম্পর্কে অনেক অদ্ভুত কাহিনি প্রচলিত আছে। অনেক অনুসন্ধানকারী এর ভিতরে ঢুকে আর ফিরে আসেননি বলেও লোককাহিনি প্রচলিত আছে। এসব রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনাই মূলত ড্যাভেলিস গুহার রহস্যময় স্থান হিসেবে খ্যাতি দিয়েছে।

ড্যাভেলিস গুহার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে গুহাটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়। এ গুহার পাশে গ্রিক শ্রমিকরা অ্যাক্রোপলিসের (গ্রিসের একটি প্রাচীন দুর্গ) ভবনে ব্যবহার করতে মার্বেল সন্ধানের জন্য খনন করছিল। সে সময় গুহাটির প্রবেশদ্বার আবিষ্কৃত হয়। গুহাটি পেন্টেলি পাহাড়ের পাশে অবস্থিত।

তবে খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে গুহাটির নাম ‘ড্যাভেলিস’ ছিল না। প্রায় দুই হাজার বছর পেরিয়ে এসে উনিশ শতকে গুহাটি ‘ড্যাভেলিস’ নামে পরিচিতি পায়। ড্যাভেলিস নামের এক ডাকাত এ গুহায় নিজের গুপ্ত আস্তানা বানিয়েছিল। সে সময় অনেকে মনে করতেন যে, এর মধ্যে ড্যাভেলিস অনেক ধন-সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিল। আর তার নামানুসারে গুহাটির নামকরণ করা হয়।

কোনো দস্যু বা ডাকাত দলের গুহায় গুপ্ত আস্তানা তৈরি করা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কারণ গুহা কিংবা পাহাড়-পর্বত, বনজঙ্গল তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যবহৃত হতো। অবশ্য নির্দিষ্ট একটি সময়ে গুহাটি উপাসনালয় হিসেবেও বিবেচিত হতো। বিশেষ করে প্যান (প্রাচীন গ্রিক ধর্ম মতে একজন দেবতা) অনুসারীদের কাছে এটি পবিত্র স্থান ছিল এক সময়।

মধ্যযুগে অর্থোডক্স খ্রিষ্টান হার্মিটরাও গুহাটিকে তাদের পবিত্র স্থান হিসাবে ব্যবহার করতো। তারা গুহার প্রবেশদ্বারে একটি ছোট গির্জাও তৈরি করেছিল। তবে প্রাচীনকাল থেকেই গুহাটিতে অতিপ্রাকৃত ক্রিয়াকলাপ ঘটতো বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। গুহাটি উপাসনালয় হিসাবে ব্যবহারের এটি অন্যতম কারণ।

প্রাচীনকাল থেকেই গুহাটিতে অতিপ্রাকৃত ক্রিয়াকলাপ ঘটতো বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। ছবি; সংগৃহীত

প্রাচীনকাল থেকেই গুহাটিতে অতিপ্রাকৃত ক্রিয়াকলাপ ঘটতো বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। ছবি; সংগৃহীত

প্রত্নতাত্ত্বিকগণ এ গুহায় খননকাজ চালিয়েছেন। সেখানে তারা মৃৎপাত্রসহ বিভিন্ন প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক উপকরণ পেয়েছেন। এসব প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো বর্তমানে জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে, যেগুলো সাইটটির গুরুত্ব প্রকাশ করে।

ড্যাভেলিস গুহায় ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনার কাহিনি রয়েছে অনেক। বিভিন্ন গুহার মধ্যে অনুভূত হওয়া অদ্ভুত তড়িৎ-চৌম্বকীয় ঘটনা নিয়ে গল্পও আছে। অনেক সময় পানি বিভিন্ন দিকে, এমনকি ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহিত হয় বলেও মনে হয়। ড্যাভেলিসকে নিয়েও এমন অনেক গল্প আছে। অনেকের এ গোলক ধাঁধাপূর্ণ গুহার মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার গল্পও রয়েছে। গুহার প্রবেশদ্বারে রহস্যময় একটি ছোট হাতের ছাপ দেখা যায় বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ। অনেকে গুহায় অদ্ভুত দৃশ্য বা অস্বাভাবিক ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন।

১৯৮০-এর দশকে গ্রিক সরকার ড্যাভেলিস গুহার আশেপাশের রহস্যময় ঘটনা দেখে সাধারণ মানুষের জন্য সাইটটি বন্ধ করে দেয়। সরকার অবশ্য সে সময় ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে, তারা গুহাটি নিরাপদ করার জন্য এর মধ্যে টানেল তৈরি করছে। তবে অনেকেই মনে করেন সরকারের আসল উদ্দেশ্য ছিল, ড্যাভেলিসের মধ্যে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়া এবং অন্যান্য বিপদ রোধ করা। আর এর মধ্যে ঠিক কী কী পরিবর্তন করা হয়েছে তা জনসাধারণের কাছ থেকে সব সময়ই লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতি এবং বিস্ফোরণের ব্যবহার লক্ষ্য করা গিয়েছে সেখানে।

মানুষের কাছে ড্যাভেলিস গুহার রহস্য আরো ঘনীভূত হয় যখন এখানকার কার্যক্রম হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে খননকৃত নতুন টানেলগুলো এখন মৃতপ্রায়। আর কিছু পুরনো টানেল পুরোপুরি সিল করে দেওয়া হয়েছে। কী কারণে টানেল তৈরির কাজ হঠাৎ বন্ধ দেওয়া হয়, তা এখনও রহস্য হিসাবেই থেকে গিয়েছে।

ড্যাভেলিসের রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা শুনে কৌতূহলী অনেকেই সেখানে ঘোস্ট হান্টিং করতে চেয়েছেন। তেমনই একজন ব্যক্তি দিমিত্রিওস মাক্রিডোপলোস। ২০১৫ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে ড্যাভেলিস গুহায় অনুসন্ধান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দিমিত্রিওস মাক্রিডোপলোস নিজের সঙ্গে একটি ‘স্পিরিট বক্স’ নিয়ে গুহার মধ্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। স্পিরিট বক্স তার নিজের আবিষ্কারের একটি যন্ত্র, যা অনুমিতভাবে রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে আত্মার সঙ্গে যোগাযোগকে উৎসাহিত করে বলে মনে করেন অনেকে। মাক্রিডোপলোস তার সঙ্গীদের নিয়ে গুহাতে একটি ইনফ্রারেড ক্যামেরা ব্যবহার করে অস্বাভাবিক ঘটনা সবকিছু রেকর্ড করার জন্য প্রবেশ করেছিলেন।

মাক্রিডোপলোস গুহা থেকে ফিরে বলেছিলেন, যে মুহূর্তে তিনি এবং তার বন্ধুরা সেই গুহায় প্রবেশ করেন, তখন তারা নিজের উপর অনেকটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। স্পিরিট বক্স তারা গুহায় ঢোকার আগেই সক্রিয় করে রেখেছিলেন। এতে শিশুদের মতো আওয়াজ রেকর্ড হয়, যেখানে একটি প্রাচীন গ্রীক ভাষায় কিছু বলছিল কেউ। মাক্রিডোপলোস এই শব্দগুলো পিক্সি বা ক্ষুদ্ৰ পরী বিশেষের ভাষা হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন।

তিনি আরো দাবি করেছিলেন যে, গুহার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর ইনফ্রারেড ক্যামেরাটিতে কিছু ভূতুড়ে ছবি ধারণ করেছিল। ধারণকৃত ছবিতে একটি কুচকুচে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যায় একটি ছোট প্রাণী টানেলের প্রবেশদ্বারের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন রহস্যময় ছবি এ গুহায় অতিপ্রাকৃত ঘটনার প্রমাণ বলেও মনে করেন অনেকে।

অতিপ্রাকৃত ঘটনার তদন্তকারীর এ দলের দাবি এবং প্রমাণ নিয়ে এখনও অনেকের মনে সংশয়ও রয়েছে। তাদের মতে গুহার মধ্যে তড়িৎ-চৌম্বকীয় ঘটনার অভিজ্ঞতার জন্য অবশ্যই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে যা অতিপ্রাকৃত সমস্ত প্রমাণকে বাতিল করে দেয়। তবুও কিছু পর্যবেক্ষক বিশ্বাস করেন যে, ড্যাভেলিস গুহায় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বাইরেও অতিপ্রাকৃত কিছু আছে।

সূত্র- হিস্টোরিক-মিস্ট্রিয়াস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here