বাংলাদেশের জন্য ‘প্রেমপত্র’ চুরি করেছিল বেলজিয়ামের এক তরুণ

নিউজ ডেস্কঃ১৯৭১ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর। বেলজিয়ামের ‘ল্য সোয়া’ পত্রিকায় একটি ফোনকল আসে-‘আমি কিন্তু পেশাদার অপরাধী নই বরং শিল্পরসিক। বয়স আমার ২০, একজন এতিম। মা বেঁচে থাকলে হয়তো এই কাজটা আমি করতাম না, কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ আমার সহ্য হয় না।’ফোনকলটি ছিল ‘থিফ অফ লিমবার্গের’নামে নিজেকে দাবী করা মা-বাবা হারা ২০ বছরের বেলজিয়ান এই তরুণ মারিও রয়ম্যান্সের।

১৯৭১ পূর্ব পাকিস্তানে চলছে ভয়াবহ গণহত্যা, মৃত্যু, ধ্বংস,পলায়ন। ছেঁড়া, জীর্ণ কাপড়ে কোন রকমে নিজের শরীর ঢেকে রাখা এক মায়ের কোলে একটি অপুষ্ট শিশু; চোখ দুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে! কিংবা পথের পাশে পড়ে থাকা মানুষের লাশ ছিঁড়ে খুবলে খাচ্ছে কুকুর, শিয়ালেরা অথবা ভীত-সন্ত্রস্ত্র হয়ে লোকজন দিগ্বিদিক ছুটছে জীবন বাঁচাতে।

মারিও রয়ম্যান্স, মা-বাবা মরা এতিম মাত্র ২০ বছরের তরুণ সে

মারিও রয়ম্যান্স, মা-বাবা মরা এতিম মাত্র ২০ বছরের তরুণ সে

দৃশ্যগুলো মুহূর্তেই অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে যায় মারিও রয়ম্যান্সের। টেলিভিশনের নব ঘুরাতে ঘুরাতে এই তরুণ জানতে পারেন জায়গাটা পূর্ব পাকিস্তান, যেখানে বিচ্ছিন্নতা দমনের নামে চলছে নির্বিচারে ভয়াবহ এক গণহত্যা। সুদূর ব্রাসেলসে বসে টিভিতে এই দৃশ্যগুলো দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না, ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা আঁটলেন। তিনি যা করলেন তা আজ অবধি বেলজিয়ামের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অপরাধের তালিকার প্রথম সারির একটা।

২৩শে সেপ্টেম্বর ১৯৭১ ব্রাসেলসের ‘মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস’ থেকে তিনি চুরি করলেন ১৭ শতকের ডাচ শিল্পী ইয়োহান ভারমিয়ারের আঁকা ‘দ্য লাভ লেটার’ নামের মাস্টারপিসটি, যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল আনুমানিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মত।

২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ছবিটি চুরি করার পর সকালের মধ্যেই সারাদেশে তোলপাড় পড়ে যায়

২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ছবিটি চুরি করার পর সকালের মধ্যেই সারাদেশে তোলপাড় পড়ে যায়

‘ল্য সোয়া’ পত্রিকার একজন সাংবাদিক ওয়াল্টার শুল্ডেনকে রয়ম্যান্স ফোন করে জানালেন চুরি যাওয়া ভারমিয়ারের  মাস্টারপিসটি এখন তার কাছে আছে এবং সেটির মুক্তিপণ হিসেবে দাবী করলেন ২০০ মিলিয়ন ফ্রাংক। যার মূল্যমান চার মিলিয়ন ডলার। সঙ্গে শর্ত জুড়ে দিলেন, টাকাটা পাঠিয়ে দিতে হবে ক্যাথলিক দাতব্য সংস্থা কারিতাসের দপ্তরে। আর সেটা অবশ্যই ব্যয় করতে হবে পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় শরণার্থীদের পেছনে! সেইসঙ্গে হুমকিও দিলেন মুক্তিপণ ছাড়া পেইন্টিংটা উদ্ধারের চেষ্টা করা হলে এটা চিরতরে হারিয়ে যাবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে তিনি সেটা বিক্রি করে দেবেন ল্যাটিন আমেরিকার এক ক্রেতার কাছে। আর সেইসাথে জাদুঘরে ভারমিয়ারের বাকি যে ৩৯ টা শিল্পকর্ম আছে, সেগুলোও চুরি করবেন।

দু’দিন পর ‘হেট ফক’নামের আরেকটি পত্রিকায় টেলিফোন করেন তিনি এবং সময়সীমা বেধে দিয়ে বলেন, ৬ অক্টোবরের মধ্যে পেইন্টিংয়ের মুক্তিপণ বাবদ ২০০ মিলিয়ন ফ্রাঙ্ক পরিশোধ না করলে তিনি পেইন্টিংটি বিক্রি করেই দেবেন। শুধু তাই নয় সেই সঙ্গে আরও কঠিন শর্ত আরোপ করে বলেন- পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্য এই মুক্তিপণ পরিশোধের ঘটনাটা টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করতে হবে। সেখানে চুক্তিপত্রে সই করার সময় ছবিটির বীমার দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ কোম্পানি ‘গ্রায়েম মিলার’-কেও উপস্থিত থাকতে হবে।

নিজেই পত্রিকা অফিসে ফোন করে চুরির কথা স্বীকার করেন মারিও, সঙ্গে দাবি করেন মুক্তিপণও

নিজেই পত্রিকা অফিসে ফোন করে চুরির কথা স্বীকার করেন মারিও, সঙ্গে দাবি করেন মুক্তিপণও

কিন্তু, শেষ রক্ষা হয়নি মারিওর। হ্যাসেটের যে পেট্রোল পাম্প থেকে ফোন করেছিলেন মারিও, তার অপারেটর ঘটনাটি শুনে ফেলেন এবং পুরষ্কারের লোভে খবর দেন পুলিশকে। গাড়ি চালিয়ে বেশীদূর যেতে পারেননি মারিও। ধাওয়ার মুখে আশ্রয় নেন এক গোয়ালে। লিমবার্গের থিফ রবিনহুড মারিওকে দুটো গরুর মাঝখানে গোবরের স্তুপে কয়েকটা খড় দিয়ে ঢাকা অবস্থায় গ্রেফতার করে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় চিত্রকর্মটি।

তার গ্রেফতারের ঘটনা বেলজিয়ানদের মধ্যে উল্টো প্রতিক্রিয়া ঘটে। তারা এই সহজ সরল তরুণের একটা মহৎ উদ্দেশ্যে এমন বেপরোয়া ও অভিনব উদ্যোগকে অপরাধ হিসেবে মানতে নারাজ। বিভিন্ন মিডিয়া সংবাদপত্রগুলো, রেডিও, টিভি মারিও রয়ম্যান্সের পাশে দাঁড়ায়। এমনকি তিনি যেখানে কাজ করতেন সেই হোটেলের মালিক কর্মচারীরাও রাস্তায় নামেন মারিও’র নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে এবং পিটিশনে স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করেন তারা।

মারিও ধরা পরে যায় পুলিশের হাতে

মারিও ধরা পরে যায় পুলিশের হাতে

এরই পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে ইউরোপীয় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাগুলো। ‘থিফ অব লিমবার্গ’ এর আড়ালে যেন ঢাকা পড়ে যায় মারিও’র আসল পরিচয়, জনতার আবেগ আর ভালবাসার কারণে প্রশাসন নরম হতে বাধ্য হয়। বিচারে মাত্র ২ বছরের সাজা হয় মারিওর, কিন্তু মানবিকতার বিবেচনায় ৬ মাস পরই মুক্তি পেয়ে যান তিনি। তবে আমরা অনেকেই হয়তো জানি না এই তরুণ বাঙালির জন্য কতখানি ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। সেভাবে ইতিহাসেও নেই তার নাম।

মারিও ৬ মাস জেলে থাকার জন্য তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়, মারা যায় মাত্র ২৯ বছর বয়সে

মারিও ৬ মাস জেলে থাকার জন্য তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়, মারা যায় মাত্র ২৯ বছর বয়সে

তবে শুধু মারিওই নয়। ১৯৭১ সালের সেই ভয়াবহ সময় বাঙালির পাশে ছিলেন অনেক ব্রিটিশ সাংবাদিকসহ বিওভিন্ন দাতব্য সংস্থা। যারা বিশ্ব দরবারে পশ্চিম পাকিস্তানের নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতার চিত্র তুলে ধরেছিলেন তারা। তাদের কল্যাণে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছিল পূর্ব পাকিস্তানে চলা গণহত্যা আর অত্যাচারের চিত্র

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here