এগারো বছরেও চালু হয়নি স্নাতকোত্তর

কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:এগারো বছর আগে ২০১১ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রা শুরু করে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগ। এই সময়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছে বিভাগিটির ৫টি শিক্ষাবর্ষের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। কিন্তু এগারো বছরেও শুরু হয়নি স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন স্নাতকোত্তর শুরু না করায় শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার অধিকারকে খর্ব করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তও করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। যার প্রভাব পড়বে ভবিষ্যতে তাদের কর্মজীবনে।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু না করার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিভাগটির শিক্ষকদের অনাগ্রহ। এখন পর্যন্ত বিভাগটির প্ল্যানিং কমিটিতে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পাঠদান শুরুর কোনে পরিকল্পনাও গ্রহণ করেনি বিভাগটি। প্রনয়ণ হয়নি সিলেবাস। এমনকি একাধিক সভায় শুরু না করার বিষয়েও আলোচনা হয়। যেখানে কারন হিসেবে ল্যাব, ক্লাসরুম এবং শিক্ষক সংকটের কথা বলা হয় । বিভাগটিতে বর্তমানে প্রায় দুই শত শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছে ১০ জন শিক্ষক । যার মধ্যে ছুটিতে আছেন ৩জন।

বিভাগে স্নাতকোত্তর চালু করার জন্যে লিখিত কোনো প্রস্তাবনাও প্রশাসনকে দেয়নি ইইই বিভাগ। যা বিভাগটির বর্তমান বিভাগ প্রধান মো. মাহমুদুল হাসান নিশ্চিত করেছেন। এমনকি এখন পর্যন্ত প্রস্তাবনা দেয়ার পরিকল্পনাও নেই বিভাগটির।

তিনি আরো বলেন, আমাদের ক্লাসরুম, ল্যাব এবং শিক্ষক সংকট থাকার কারণে স্নাতকোত্তর খোলা সম্ভব হচ্ছে না। স্নাতকোত্তর খোলার বিষয়ে বিভাগের শিক্ষকদের অবস্থানের পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন খোলার পক্ষে তবে অবশ্যই সংকট দূর করে।

সংকট দূর করার আশা জানালেও তার প্রমাণ মেলেনি বিভাগটির কার্যক্রমে। এখন পর্যন্ত পাঠক্রম তৈরি এবং কোনো প্রকার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত স্নাতকোত্তর  বিষয়ে নেননি তারা।

বিশ্বস্ত একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে বিভাগটির প্ল্যানিং কমিটির সভাতেও খোলার বিষয়ে অধিকাংশের অনাগ্রহ। এমনকি খোলার বিষয়ে কোনো লিখিত দলিলও নেই বিভাগটিতে। যা স্বীকার করেছে মো. মাহমুদুল হাসান।
তবে শিক্ষকদের অবস্থান পরিবর্তনের কথাও বলেন তিনি।

তবে এতো বছর পরেও স্নাতকোত্তর না চালু করাকে অন্যায় এবং শিক্ষার্থীদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের(ইউজিসি)  সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব)  ড. ফেরদৌস জামান।

তিনি আরো বলেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে  কেবল স্নাতকের অনুমোদন পেলেই সেই বিভাগ একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন নিয়ে স্নাতকোত্তর, এম ফিল, পিএইচডি পর্যন্ত করা যেতে পারে। এমনকি তারা ডিপ্লোমাও করাতে পারে। যা হয়েছে সেটা হতে পারে না এবং তা শুভ লক্ষণ নয়। কোনো লিখিত অভিযোগ আসলে সেটি নিয়ে ইউজিসি দেখবে বলেও মন্তব্য করেছেন ড. ফেরদৌস জামান।

এগারো বছরে কেনো স্নাতকোত্তর শুরু হলো না এমন প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার(ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ড. হুমায়ূন কবীর বলেন, বিভাগ থেকে আমাদের এখানে লিখিত কোন প্রস্তাবনা দেননি এবং উদ্যোগ নেয়নি বিভাগ  তাই এই অবস্থা। তারা প্রয়োজন বোধ করলে জানাতো। তবে সম্প্রতি বিষয়টি ভিসি স্যারের নজরে আসার পর উদ্যোগ নিতে বলেছে বিভাগকে।

ভিসি অধ্যাপক ড. এএইচএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাকে না জানালে তো সব বিষয় জানা সম্ভব নয়। আমিও অবাক এতো বছরে কেনো হয়নি। তবে কিছুদিন হলো জানার পরে আমি এই নিয়ে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছি। কেবল স্নাতক শ্রেণির পরিচালনাতেও বিভাগটির নামে রয়েছে একাধিক অভিযোগ। রয়েছে তীব্র সেশনজট। স্নাতক সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীরা  স্নাতকোত্তর চালুর জন্যে শিক্ষকদের কাছে গেলেও সদুত্তর মেলেনি বিভাগ থেকে।

বিভাগটির সেশনজট নিয়ে প্রতিবেদন করতে গেলে গণমাধ্যমকর্মীদের হয়রানি করারও অভিযোগ রয়েছে বিভাগটির সাবেক বিভাগ প্রধান লিটন কুমার বিশ্বাসের নামে। ফোকলোর বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ড. সাইফুল ইসলামকে দিয়ে গনমাধ্যম কর্মী সরকার আব্দুল্লাহ তুহিনকে সংবাদ না করতে চাপ সৃষ্টি করেছিলো বলেও জানায় সরকার আব্দুল্লাহ তুহিন।

তিনি বলেন, নিউজের জন্য বিভাগীয় প্রধানের মন্তব্যের জন্য আমি লিটন স্যারকে ফোন দিয়েছিলাম এবং পরদিন বিভাগে দেখা করার জন্য বলেন। উনার দেয়া সময় অনুযায়ী আমি বিভাগে গেলে উনি ব্যস্ততা দেখিয়ে কথা বলেননি। এর মাঝে আমার সেই সময়ের  বিভাগীয় প্রধান স্যারকেও বিষয়টা তিনি জানান। পুনরায় ফোন করলে তিনি বিকেলে দেখা করতে বলেন। দেখা করতে গেলে সাংবাদিকতা না করতে পরামর্শ দেন। সেই সময় ইইই বিভাগের মাহবুব স্যার ও আরো একজন শিক্ষক নিয়ে বসে ছিলেন। সকলে মিলে আমার ব্যক্তিগত তথ্য জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন। আমি নাকি কারো ইন্ধনে নিউজটি করতে চাচ্ছি।  নিউজ না করতে এক সিনিয়র সাংবাদিক দিয়েও ফোন করিয়েছিলেন লিটন কুমার বিশ্বাস স্যার।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা অনেকবার স্যারদের কাছে গিয়েছি। গিয়ে লাভ হয়নি। লিটন স্যার আমাদের বলে তোমাদের মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) করানোর মতো এখনো যোগ্য আমরা হইনি । উচ্চতর শিক্ষা না নেয়ার আগে সম্ভব নয় বলে তিনি  আমাদের কথা আর শুনতেই চাননি। এর পরে আমরা সাবেক ভিসি স্যার , ট্রেজারার স্যার, রেজিস্ট্রার স্যারের কাছে গিয়েও ফলাফল পাইনি। আমাদের জুনিয়রা কিছু বলতে চেষ্টা করেছিলো কদিন আগে। তাদের ভয় দেখানো  হয়। দশম ব্যাচ(২০১৫-১৬)  তো এখনো অনার্স শেষই করতে পারেনি। আমরা ৪ বছরের অনার্স সাড়ে ৬ বছরে শেষ করেছি তবু রেজাল্ট পেতে গিয়ে সাত বছর চলে গেছে।

তবে কোনো মন্তব্য করতে চাননি শিক্ষার্থীদের অভিযোগ থাকা সাবেক বিভাগীয় প্রধান লিটন কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, আমি ছুটিতে আছি। আমি দেশে ফিরে যেদিন জয়েন করব, সেইদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা করব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here